তবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণায়ও এসেছে কিছুটা নতুনত্ব। নানা কৌশল ও মাধ্যমে প্রার্থীরা চাইছেন ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে।
বেশ কিছু নির্বাচনী এলাকা ঘুরে চোখে পড়েছে প্রচারণার এই পরিবর্তন। পুরানো আমলের চোঙ্গা ও মাইক ঘুরে এখন নির্বাচনী প্রচারণায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছে হ্যান্ড মাইক। বিভিন্ন এলাকায় মিছিলের সঙ্গে স্থান করে নিয়েছে উঠান বৈঠক।
আর নির্বাচনী আইনের মারপ্যাচে হারিয়ে যাওয়া দেয়াল লিখনের স্থান দখলে নিয়েছে ডিজিটাল ব্যানার। পোস্টারের বিকল্প হিসেবে ‘আবির্ভূত’ হয়েছে ফেস্টুন ও পলি-প্যানা। কালের আবর্তে হারিয়ে গেছে কাপড়ের ব্যানার ও কলাগাছ-দেবদারু পাতা বা রঙিন কাগজে তৈরি তোরণ।
আবার কোথাও কোথাও দেখা মিলেছে প্রচারণায় সাংস্কৃতিক আবহের। এক্ষেত্রে দেশের জনপ্রিয় শিল্পীদের গাওয়া কালজয়ী ও লোকগানে শব্দ পরিবর্তন একই সুরে করা হচ্ছে ভোট প্রার্থনা। চলছে প্রার্থীদের গুণকীর্তন। এতে অংশ নিচ্ছেন হালের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পীরা। কখনও চলছে খ্যাতিমান আবৃত্তিকারের মাধ্যমেও ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই কাজে রাজধানীর মগবাজার ও ইস্কাটনের স্টুডিওগুলো ব্যস্ত সময় পার করছে।
তবে সবচেয়ে বড় প্রচারণা চলছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে। প্রার্থীরা নির্বাচন উপলক্ষে খুলেছেন নিজেদের প্রচারণা পেজ। সেখানে পোস্ট করা হচ্ছে তাদের নানা কর্মকাণ্ডেরর ছবি ও ভিডিও।
ভোটারদের উদ্দেশ্যে দেওয়া প্রতিশ্রুতিমূলক বক্তব্যের ভিডিও পোস্ট হচ্ছে ইউটিউবেও। বিভিন্ন জনসভায় দেওয়া বক্তব্য অনেক প্রার্থীই নিজেদের ফেসবুক পেজে লাইভ করছেন।
আবার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর নেওয়া অবৈধ সুযোগ-সুবিধা, মিথ্যা ঘোষণা ও তাদের সমর্থকদের হামলার দৃশ্যও দিতে ভুল করছেন না কেউ কেউ।
বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় সংসদ সদস্য (এমপি) থাকাকালে কিংবা দলের এমপি যেসব উন্নয়ন করেছেন সেগুলো নিয়ে তৈরি করা হয়েছে প্রামাণ্যচিত্র।
যা স্থানীয় কেবল অপারেটরদের মাধ্যমে প্রচারের পাশাপাশি ভোটারদের মাঝেও তুলে ধরা হচ্ছে।
এদিকে এবারের নির্বাচনে প্রচারের উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, দুই বড় জোটের হয়ে দেশের তারকা কণ্ঠশিল্পী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, চলচ্চিত্র অভিনেতা-অভিনেত্রী, খেলোয়াড়দের জনসংযোগে ব্যাপকভাবে অংশ নেওয়া।
টেলিভিশনসহ বিভিন্ন মাধ্যমে তারকাদের নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যাপকভাবে অংশ নেওয়া এটাই প্রথম! জনসভায় জোট বা দলের হয়ে প্রচারণা করছেন তারা।
পাশাপাশি সড়ক পথে প্রচারাভিযানে অংশ নিয়ে যাত্রাপথে আয়োজিত পথসভায় তারকারা সংশ্লিষ্ট আসনের প্রার্থীর হয়ে ভোট চাইছেন ভোটারদের কাছে।
এছাড়া সংশ্লিষ্ট সংসদীয় আসনগুলোর ভোটারদের মোবাইল নম্বরে এসএমএসের মাধ্যমে প্রার্থীদের কাছে ভোট চাওয়া হচ্ছে। অটো ফোন কলের মাধ্যমেও পাঠানো হচ্ছে অডিও বার্তা।
প্রার্থীদের এসব প্রচারণায় নির্বাচনী আমেজে মেতে রয়েছেন ভোটাররাও। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিত্যনতুন প্রচারণা কৌশলও উপভোগ করছেন তারা। এ নিয়ে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ছাত্র মুশফিক আহসানের সঙ্গে।
নতুন এই ভোটার ঢাকায় থাকলেও তাকে ভোট দিতে হবে দিনাজপুরে গ্রামের বাড়িতে। গত সপ্তাহে গ্রাম থেকে ফিরেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, এলাকায় প্রার্থীদের প্রচারণায় দেখে এসেছি নিত্যনতুন কৌশল, যা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিন হয়েছে।
‘তারা (প্রার্থী) যেকোনোভাবেই চাইছেন তাদের বার্তা ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে। আর তাতে ব্যবহৃত হচ্ছে প্রযুক্তির সবশেষ সুযোগটুকু। এটাও কিন্তু দেশের এগিয়ে যাওয়ার উদাহরণ। ’
একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মাশরুর জামান বলেন, রাজধানীর মেগাসিটি আউট লুক, হাইরাইজ রেসিডেন্স, নাগরিকদের ‘ভেরি ফার্স্ট লাইফ লিড’ ও বর্ধণশীল মধ্যবিত্ত সমাজের প্রসারের কারণে ঢাকায় নির্বাচনের প্রচারণায় তেমন উৎসব লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। কিন্তু নগর থেকে একটু বের হলেই চোখে পড়ছে নির্বাচনী প্রচারণার উৎসবের আমেজ।
‘তবে আগের মতো উৎসবটা কোথাও নজরে পড়ে না ঠিক মতো। প্রচারণা চলছে ভিন্নভাবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, কেবল টিভি ও সঙ্গীতের মাধ্যমে। প্রযুক্তির এই ব্যবহার সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে,’ যোগ করেন এই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক।
বাংলাদেশ সময়: ০১০৪ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ২০, ২০১৮
আরএম/এমএ