পুরান মতে, মা দেবকীর গর্ভে অষ্টম সন্তান হিসাবে শ্রীকৃষ্ণ মানুষ রূপে জন্মগ্রহণ করেন। দেবকীর ভাই অর্থাৎ কৃষ্ণের মামা কংস ছিলেন অত্যাচারী রাজা।
বাণীতে বলা হয়, ‘কংস তোমার পাপের সীমা অতিক্রম করেছো। মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসছে। আর তোমাকে যে মারবে, সে তোমার বোনেরই সন্তান। ’
এই শুনে দিগ্বিদিক হারিয়ে ফেলেন কংস। প্রাণপ্রিয় বোন দেবকী ও তার স্বামী বাসুদেবকে মারতে যান তিনি। হাজার অনুরোধে ও একটি শর্তে দুজনকে না মেরে কারাগারে বন্দী করেন কংস।
শর্ত হয় যে, দেবকীর ভূমিষ্ঠ সন্তানকে তুলে দিতে হবে কংসের হাতে। কংস নিজের নজরে ও শিক্ষায় বড় করে তুলবে সন্তানকে। যাতে সেই সন্তান কংসকে আর মারতে না পারে।
শর্ত অনুযায়ী, সন্তান হওয়া মাত্রই তুলে দেওয়া হয় কংসের হাতে। কিন্তু কথা রাখেননি মামা। বোন দেবকী ও তার স্বামী বাসুদেবের সামনে সদ্যজাত সন্তানকে শূন্যে ছুড়ে মারেন। একই কায়দায় দেবকীর সাত ভূমিষ্ঠ সন্তানকে মেরে ফেলেন কংস।
ক্ষোভে কষ্টে ঈশ্বরের আরাধনায় দিন কাটতে থাকে দেবকী ও বাসুদেবের। এরপর ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে মধ্যরাতে প্রচণ্ড বৃষ্টিতে দেবকীর অষ্টম সন্তান রূপে জন্ম হয় শ্রীকৃষ্ণের। দৈববাণী অনুযায়ী, সেই অষ্টম সন্তানই নিধন করেন অত্যাচারী কংসেকে।
অন্যায়কে নিধন করার জন্য শ্রীকৃষ্ণের জন্মতিথিতে মন্দিরে মন্দিরে পূজা দেন সনাতন ধর্মাম্বলম্বীরা। সারাদিন নির্জলা উপবাস করে মধ্য রাতে শ্রীকৃষ্ণের বাল্যরূপ গোপালের মুর্তিকে নিজের স্নেহের সন্তানের মতো সাজিয়ে, তার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন রকম মিষ্টান্ন অর্পণ করে তবেই শেষ হয় তার পূজা।
মিষ্টির মধ্যে প্রাধান্য পায়- তালের বড়া, মালপোয়া ও দুধ দিয়ে তৈরি বিশেষ ক্ষীর। এছাড়া থাকে ঘি-মাখন ও দুধের তৈরি নানা মিষ্টি। সঙ্গে থাকে চাল-ডালের মিশ্রণে খিচুড়ি, শাক-সবজিসহ নানা পদ। যা পরে ভোগ হিসাবে বিতরণ করা হয়।
জন্মষ্টমী উপলক্ষে রাজ্যবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠি এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজভবন থেকে এক বার্তায় রাজ্যপাল বলেন, ‘এ রাজ্যে যুগযুগ ধরে পালন হয়ে আসছে জন্মষ্টমীর ঐতিহ্য। শাস্ত্রমতে এদিনই শ্রীকৃষ্ণ জন্মগ্রহ করে। এই উপলক্ষে সারা রাজ্যে অসংখ্য কৃষ্ণ মন্দিরে সমাগম হয় ভক্তদের। সবাইকে জন্মষ্টমীর শুভেচ্ছা। ’
রাজ্যবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বলেন, শান্তিপূর্ণভাবে রাজ্যে জন্মষ্টমী উদযাপিত হচ্ছে। ধর্মের সঙ্গে রাজনীতির রঙ পশ্চিমবঙ্গবাসী কখনো বরদাস্ত করে না। কেউ কেউ উৎসবের মধ্যেও বিভেদ সৃষ্টি করতে চান। সেই বিভেদকামী শক্তিকে পরাস্ত করে আমরা চাই, রাজ্যে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে জন্মষ্টমী উদযাপিত হোক।
ইতিহাস বলে, ৩২২৮ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে ১৯ জুলাই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্ম হয়। রাখি বন্ধনের আটদিন পরে সারা ভারতে কৃষ্ণ জন্মাষ্টমী উৎসব উদযাপন করা হয়।
ওইদিন দক্ষিণ ভারতে পালন করা হয় গোকুলাষ্টমী; যা মহারাষ্ট্রে করা হয় দইয়ের হাঁড়ি ভেঙে। মথুরায় শ্রীকৃষ্ণের জন্ম হলেও তবে তিনি বেড়ে ওঠেন বৃন্দাবনে। সেজন্য শ্রীকৃষ্ণের আরাধনা সবচেয়ে বড় মাপের হয় বৃন্দবনে। শুধু বৃন্দাবনেই চারশো কৃষ্ণ মন্দির আছে।
যুগ যুগ ধরে দেবকীর অষ্টম সন্তান শ্রীকৃষ্ণের বাল্য রূপ গোপালের পূজা হয়ে আসছে জন্মাষ্টমীর দিনে। রোববারই সেইদিন। রোববার জন্মাষ্টমী পালন হলেও সরকারিভাবে সোমবারও ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সময়: ১৬০৭ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ০২, ২০১৮
ভিএস/এমএ